অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি: সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট

অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি: সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট

বাংলাদেশে প্রতিবছরই অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিকদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৩৭৭টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২৯৫টি। দুই বছরের তুলনায় এ বছর ২৮% বেশি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।


এ ধরনের মৃত্যু প্রায়শই হত্যাকাণ্ড বা দুর্ঘটনার কারণে ঘটে থাকে, কিন্তু তাদের পরিচয় জানা কঠিন হয়ে পড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে না পারার কারণে এগুলোর দাফন করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বা অন্য কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের আইনি ও মানবিক কাঠামোর জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই মরদেহগুলোর বেশিরভাগই পুরুষের, যা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিশেষত গত জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকালে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা হত্যাকাণ্ড এবং আন্দোলনে অংশ নেয়া লোকদের মধ্যে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থান এবং জেলার বিভিন্ন কবরস্থানে এসব মরদেহ দাফন হয়েছে, যার মধ্যে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান অন্যতম।


ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের ইনচার্জ, রামু চন্দ্র দাস জানান, এসব অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের মধ্যে অনেকেই গুলিবিদ্ধ, যার মধ্যে সাতটি মরদেহ এখনও শনাক্ত হয়নি। এমনকি, সেগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, তবে কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি।


এই পরিস্থিতির পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। একদিকে, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অপরদিকে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ফলে এমন অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সংখ্যা বেড়ে চলছে। এমএসএফ প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাঈদুর রহমান মনে করেন, এই মরদেহগুলোর অধিকাংশই আন্দোলনকালে নিহত হয়, কিন্তু তাদের স্বজনরা বা পরিচিত কেউ মরদেহ শনাক্ত করতে আসেননি।


তবে, বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে যে, তারা অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ শনাক্ত করতে তৎপর রয়েছেন এবং বর্তমানে সিআইডি এর মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের প্রচেষ্টা চলছে। তবে এসব প্রক্রিয়ায় সময় লাগে, বিশেষত মরদেহ পচে গিয়ে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়।


এটি একটি গভীর মানবিক সমস্যা যা আমাদের সমাজের অন্ধকার দিককে ফুটিয়ে তোলে। দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হলে, এসব অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের যথাযথ তদন্ত ও দ্রুত শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।


এই ধরনের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মৃত্যুর পরেও একজন মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, আমাদের সামাজিক দায়িত্বের অংশ।

অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি: সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট

অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি: সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট

Share this article:

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ খবর