১৯৫৭ সালের ৪ঠা অক্টোবর, মহাকাশ গবেষণার এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। সোভিয়েত প্রযুক্তিবিদরা পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ, স্পুটনিক-১, সফলভাবে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেন। এই ঘটনা শুধুমাত্র প্রযুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং পৃথিবীর দুই প্রধান পরাশক্তি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহের অংশ হিসেবে প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয়, যেখানে মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর ঐতিহাসিক ঘটনার কথা স্মরণ করা হয়। মহাকাশে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম সাফল্য, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের সতর্কতা হিসেবে কাজ করে। তাদের বিশেষজ্ঞরা আশা করেছিলেন যে, এই ধরনের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসবে, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এই পথপ্রদর্শক ভূমিকা গ্রহণ করল।
১৯৫০ সালের দশক:
যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন, উভয়ই ১৯৫০ সালের দশকে নতুন প্রযুক্তির বিকাশে একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে নাৎসি জার্মানির আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই সেই প্রযুক্তি নিজেদের মতো ব্যবহার করার জন্য কাজ করছিল।
স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ:
১৯৫৭ সালের ৪ঠা অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন সফলভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ করে, যা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। এই ঘটনা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য একটি বিশাল জয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অস্বস্তিকর হার। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তারা হতবাক হয়ে যান এবং স্পুটনিক উৎক্ষেপণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কর্মসূচিতে ঘাটতি অনুভূত হতে থাকে।
প্রতিক্রিয়া এবং ‘স্পেস রেস’ শুরু:
এ ঘটনার পর, ১৯৫৭ সালের ডিসেম্বর মাসে হোয়াইট হাউস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রজেক্ট ভ্যানগার্ডের পরীক্ষাটি চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, কিন্তু সেটি ছিল একটি চরম ব্যর্থতা। এরপর, ১৯৫৮ সালের ৩১শে জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র স্পুটনিকের জবাব দেয় ‘দ্য এক্সপ্লোরার’ নামে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে। এই ঘটনাটি ‘স্পেস রেস’ বা মহাকাশ দৌড়ের সূচনা করে, যা পরবর্তী বছরগুলোতে দুটি পরাশক্তির মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা তৈরি করে।
স্পুটনিক-১ এর বৈশিষ্ট্য:
স্পুটনিক-১ ছিল একটি অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি গোলাকার উপগ্রহ, যার ব্যাস ছিল ৫৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ছিল প্রায় ৮৪ কেজি। এটি পৃথিবীকে ৯০০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে প্রদক্ষিণ করছিল এবং প্রতি সেকেন্ডে আট কিলোমিটার গতিতে চলছিল। এর ভিতরে একটি স্বল্প শক্তির রেডিও ট্রান্সমিটার বসানো ছিল, যার মাধ্যমে পৃথিবী থেকে যে কোনও রেডিও শ্রোতা সংকেত শুনতে পেত।
স্পুটনিক-১ এর সফল উৎক্ষেপণ কেবলমাত্র একটি প্রযুক্তিগত অর্জন ছিল না, বরং এটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক এবং সামরিক সাফল্য। এর মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীজুড়ে নিজেদের শক্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। পরবর্তী সময়ে, এই প্রতিযোগিতা মহাকাশে নতুন যুগের সূচনা করে, যা মানবজাতির জন্য অনেক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।
মহাকাশে সোভিয়েত প্রযুক্তির শুরুর ধাক্কা: যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ